সরকার দেশকে খাদ্য স্বয়ং সম্পূর্ণ করতে কৃষকদের ভর্তুকি, প্রণদনা সহ বিভিন্ন সহায়তা করে আসছে। কৃষক ও কৃষি উন্নয়নে সরকার সেচ আইন প্রণয়ন ও বিধিমালা জারী করেন। এদিকে নাগেশ্বরী ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলার অগভীর নলকূপ লাইসেন্স প্রদানে বিএডিসির উপ-সহকারী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া নুরুল সেচ আইন অমান্য করে চিহ্নিত দালাল চক্রের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ব্যাঙের ছাতার মতো যত্রতত্র সেচ লাইসেন্স অনুমোদন দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলা সেচ কমিটিকে অসত্য তথ্য উপস্থাপন করে একাই রাজত্ব কায়েমের মাধ্যমে সেচ আইন প্রণয়ন ও বিধিমালা অমান্য করে মোটা অঙ্কের টাকা বিনিময়ে নাগেশ্বরী উপজেলায় ৭৬৩টি এবং ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় ২৩৬টি অগভীর নলকূপের লাইসেন্স চলতি বছর জুলাই মাসে অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে বিএডিসির তালিকা অনুসারে দেখা গেছে, নাগেশ্বরী উপজেলার দুধকুমার নদীর পুর্বপাড় কেদার ইউনিয়নে ১৬৫, কচাকাটা ইউনিয়নে ১০৭, বল্লভেরখাস ইউনিয়নে ৯৩, নারায়নপুর ইউনিয়নে ৫৬টি সহ ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার মধ্যে অধিকাংশই সেচ নীতিমালা বহির্ভূত। কেদার ইউনিয়নের বালাবাড়ী গ্রামে একই পরিবারের আমজাদ আলীর নামে একটি ও তার স্ত্রী জাহানারা বেগমের নামেও একটি, জোনাব আলীর পরিবারে চারটি, আল আমিনের নামে একটি নলকূপের সেচ এবং পৌরসভার আরাজী কুমরপুর গ্রামে একই পরিবারের হুকুম, হাকিম ও মতিয়ার রহমান, বাবলু এবং শহিদুল মাস্টার কে লাইসেন্স নীতিমালা তোয়াক্কা করে অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
অপরদিকে রামখানা ইউনিয়নের সীমান্ত ঘেষা ঠোস চারিদিক গোলাকার প্রসাদের কুটি এলাকায় ৮০পরিবারের ঘরবাড়িসহ মোট ৯০একর জমিতে ৭জন লাইসেন্স প্রাপ্ত খলিলুর রহমানের নামে ২টি থেকে ২শত ফিড দুরে তৈয়ব আলী, ছলিম উদ্দিন, মন্টু মিয়া, আলতাফ ও আব্দুর রউফকে অবৈধভাবে লাইসেন্স অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এমনকি বিএমডিএর গভীর নলকূপের এরিয়ার মাঝে আরাজী কুমরপুর গ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অবৈধভাবে অনেক সেচ লাইসেন্স অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিএডিসির ও দীর্ঘদিনের পল্লী বিদ্যুতের চিহ্নিত দালাল মাদারগঞ্জের উজ্জ্বল, ছোট খামারের শহিদুল ইসলাম, কচাকাটা চর টাপুর আলম, সুবলপাড়ের সাহা আলম ও বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের নবীবুর রহমান নবীন, সুজন ও নেওয়াশী ইউনিয়নের ফকিরেরহাটের লিটন মিয়াসহ ৩০জন চক্র প্রতি সেচ লাইসেন্স ও বিদ্যুৎ সংযোগে ৭০হাজার টাকা চুক্তিতে হাতিয়ে নিয়ে বিএডিসির উপ-সহকারী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া নুরুলের সাথে যোগসাজশ করে লাইসেন্স দিচ্ছেন বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন।

হাসনাবাদ ইউনিয়নের মনিয়ারহাট গ্রামের আরিফুল জানান, নাগেশ্বরী বিএডিসি অফিসে সেচ লাইসেন্সের জন্য সঠিকভাবে আবেদন করে টাকা দিতে না পারায় তাকে লাইসেন্স হয় নাই। বিএডিসি অফিস এখন দালালের নৈরাজ্য।
ভুক্তভোগী মকবুল হোসেন, আব্বাছ আলী, আশরাফুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম, হাসেন আলী অভিযোগ করে বলেন, নাগেশ্বরীতে ৭৬৩টি এবং ভুরুঙ্গামারীতে ২৩৬টি অগভীর নলকূপের লাইসেন্সের মধ্যে তিনভাগ লাইসেন্স অবৈধ। দালালের মাধ্যমে টাকা নিয়ে বিএডিসির উপ-সহকারী প্রকৌশলী এসব বহির্ভূত লাইসেন্স অনুমোদন দিয়েছে। বিএডিসি অফিসে সেচ লাইসেন্সের আবেদন সঠিকভাবে করেও লাইসেন্স থেকে বঞ্চিত। অফিসে দালাল ছাড়া কোন সেচ লাইসেন্স পাওয়া যায় না। অবৈধভাবে এতো লাইসেন্স দেয়ায় কারণে লাইসেন্সধারীরা সেচ সংযোগ নিয়ে বোরো মৌসুমে প্রতি বিঘা জমিতে আবাদে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা নিরিহ কৃষকদের থেকে আদায় করছেন।
নুনখাওয়া ইউনিয়নের মন্ডলেরভিটা গ্রামের আব্দুল আউয়াল জানান, আমি ২ নভেম্বর ২০২০খ্রিঃ সেচ লাইসেন্স পেয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে সেচ চালিয়ে আসছি। আমার সেচ লাইসেন্সের পাশে এ কে এম ফজলুল হক, রইচ উদ্দিন ও আমিনুল ইসলাম অর্থের বিনিময়ে বহির্ভূতভাবে সেচ লাইসেন্স নিয়েছে। বিধি মোতাবেক কৃষকদের একত্রে সেচ লাইসেন্স দিলে সেচ ব্যবসা কমে আসবে ও সাধারন কৃষকগণ উপকৃত হবে।
বেরুবাড়ী ইউনিয়নের শালামারা টুপামারী গ্রামের আনিছুর রহমান জানান, দালাল না ধরার কারনে আমাকে নলকূপের সেচ লাইসেন্স দেয়া হয়নি। কিন্তু আমার আবেদনকৃত স্থানের মাত্র ১৫০ফুড দুরে শামছুল হক প্রধানকে সেচ লাইসেন্স প্রদান করা হয়। শামছুল হক প্রধান মাত্র ৫ফুড পাইপ পুতে দালালের মাধ্যম সেচ নিয়ে ৪শত ফুড দুরে মটর লাগিয়ে সেচ চালাচ্ছেন। ইউএনও বরাবরে অভিযোগ করে তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলেও বিচার থেকে বঞ্চিত।
নাগেশ্বরী পৌরসভার আরাজী কুমরপুর গ্রামের আবু তাহের জানান, আমার বরেন্দ্র গভীর নলকূপ থেকে মাত্র ৫শত ফুড দুরে বিএডিসি অর্থের বিনিময়ে অবৈধভাবে একটি অগভীর নলকূপের লাইসেন্স দেয়ার অভিযোগ করেন। সেচ চালান চুনু মিয়া। এ বিষয়ে একাধিকবার অভিযোগ করেও মেলেনি প্রতিকার।
বিএডিসির উপ-সহকারী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া নুরুল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমাদের কিছু ত্রুটি ও ভুলের জন্য সেচ লাইসেন্সে কিছু সমস্যা আছে। আমি সে সব সেচ দেখছি। অফিসে আসেন একটু কথা বলবো।
বিএডিসি’র নির্বাহী প্রকৌশলী আলতাফ হোসেন বলেন, সেচ লাইসেন্সের তালিকা এখনো হাতে পাইনি। অভিযোগ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কুড়িগ্রাম লালমনিরহাট পল্লী বিদ্যুত সমিতির নাগেশ্বরী জোনাল অফিসের ডিজিএম আতিকুর রহমান জানান, জনগন কোনমতে বিএডিসি হতে লাইসেন্স নিয়ে আসতে পারলেই হলো, তারপর আমার উপর হয় চাপ সৃষ্টি। আমি সেচ কমিটির সভায় যথাযথ পন্থায় সেচ লাইসেন্স প্রদান করতে বলার পরেও নীতিমালা মানা হচ্ছে না। সদ্য লাইসেন্স প্রাপ্ত ৬টি স্থানে আমি নিজে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায় ৫টিরই দুরুত্ব মানা হয়নি বা উপযুক্ত স্থানে লাইসেন্স প্রদান করা হয়নি। আমরাও বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা সেচ কমিটির সভাপতি নুরুল আহমেদ মাছুম বলেন, অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কুড়িগ্রাম জেলা বিএডিস’র সহকারী প্রকৌশলী মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, উপজেলা সেচ কমিটির মাধ্যমে এসব লাইসেন্স দেয়া হয়েছে উপ-সহকারী প্রকৌশলী যদি অনিয়ম করে থাকেন তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ইউএনও’র মাধ্যমে তথ্য নিয়ে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বিএডিসির প্রধান কার্যালয়ের সদস্য পরিচালক জিয়াউল হক বলেন, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচার করেন। সংবাদের প্রেক্ষিতে অতি গুরুত্বের সাথে বিএডিসির হেড অফিস থেকে তদন্তের জন্য একটি অডিট টিম পাঠানো হবে। তদন্তে ক্ষুদ্র সেচ নীতিমালা অনুযায়ী অনিয়ম পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

