আব্দুল মজিদ পাগলার আশা-ভরসা ও শেষ আশ্রয়স্থল বিধবা দুই বোন

জাতীয় রংপুর সারাদেশ হোম

কুড়িগ্রাম: জন্মগতভাবে শারীরিক অক্ষমতা সম্পন্ন হওয়া ও স্ত্রী-সন্তান না থাকায় দুই বিধবা বোনই আশা ভরসা ও শেষ আশ্রয়স্থল আব্দুল মজিদ (৬৪) এর। কিন্তু সেখানেও কেউ উপার্জনক্ষম না হওয়ায় দিন কাটাতে হচ্ছে অতিকষ্টে। আব্দুল মজিদের বাড়ি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের পশ্চিম অনন্তপুর গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের বাকুয়ার ভিটার মরহুম মোহাম্মদ আলীর ছেলে। গ্রামের সবাই তাকে মজিদ পাগলা হিসেবেই চেনেন।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেল, আব্দুল মজিদ জন্মগতভাবেই শারীরিক অক্ষমতা সম্পন্ন ছিলেন। হাঁটাচলা করার সময় নিজের শরীরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারতেন না। একদিকে যেতে চাইলে লক্ষ্য স্থির করতে না পেরে অন্যদিকে চলে যেতেন। তারপরও কোনোরকমে ধীর গতিতে নিজ এলাকাতেই ঘোরাফেরা করতেন। তখন বিভিন্ন জনের কাছ থেকে সাহায্য সহযোগিতা নেয়া ও ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু বার্ধক্য ও নানান রোগের কারণে তার জীবন হয়েছে এক দুর্বিষহ। এখন পুরোপুরি ভাবে হাঁটাচলায় অক্ষম হয়ে পড়ায় দিনরাত শুধু শুয়ে বসেই কাটান। জীবনে অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে বৃদ্ধ বয়সে এসেও ভালো নেই তারা তিন ভাইবোন। পৈত্রিক ভিটায় মাথা গোঁজার ঠাঁই হলেও নেই কেউ উপার্জনক্ষম। যার ফলে খেয়ে না খেয়ে অতি কষ্টে দিনযাপন করতে হচ্ছে তাদেরকে।

শুক্রবার বিকেলে আব্দুল মজিদ পাগলার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, জীর্ণ শীর্ণ একটি টিনের ছাপরায় চৌকির উপর বসে আছেন তিনি। প্রচন্ড রোদে মাথার উপরের টিনগুলো থেকে গরম নামছে নিচে। ভ্যাপসা গরমে ঘেমে গিয়ে শরীর বেয়ে পানি পড়ছে আব্দুল মজিদের। তার ঘরের আসবাবপত্র বলতে শুধুমাত্র কাঠের পাটাতনের চৌকিটা ছাড়া আর কিছুই নেই। ঘরের দুই খুটির মাঝে রশি বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেছেন তার ব্যবহৃত কয়েকটি জামাকাপড়। তার ঘরের ভেতর ঢুকতেই তিনি অপরিচিত লোক দেখে চমকে উঠলেন। পরে স্থানীয় আরো কয়েকজন লোককে দেখার পর অনেক খুশি হয়ে মলিন একটা হাসি দিলেন। কেমন আছেন জানতে চাওয়ার পর তার চোখ অশ্রুতে ছল ছল হয়ে গেল।

আব্দুল মজিদ পাগলা অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, হাঁটাচলা করতে অনেক কষ্ট হলেও আগে ধীরে ধীরে বাইরে চলাফেরা করতেন। এলাকার বিভিন্ন মানুষের সাথে দেখা সাক্ষাত ও কথাবার্তা হতো। এখন শরীরে আর আগের মত শক্তি পান না। এক বছর ধরে শুধু ঘরের মধ্যেই পড়ে আছেন। সবসময় বদ্ধ ঘরে শুয়ে বসে থাকতে থাকতে অসুস্থতা যেন আরো বেড়েই চলেছে। সমাজের হৃদয়বান দানশীল ব্যক্তিদের নিকট সহায়তা কামনা করে বলেন, কেউ একটা হুইলচেয়ার কিনে দিলে তিনি বাইরের মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতেন।

মজিদ পাগলার দুই বিধবা বোন জমিলা বেওয়া ও ছালেহা বেওয়া বলেন, আমাদের তিন ভাইবোনের মিলে পৈত্রিক ভিটে মাটি আট শতক জমি ছাড়া আর কিছু নাই। আমাদের অর্থ সম্পদ নাই ভাইয়েরও কোন কিছু নাই। আমরা নিজেরা অভাব অনটনের মাঝে থাকলেও ভাইয়ের এই অচল অবস্থায় ফেলে তো আর দিতে পারি না। এখন আমরা দুই বিধবা বোন এই পাগল ভাইকে নিয়ে পৈতৃক ভিটায় কোনরকমে দিন পার করছি। ভাই সব সময় বদ্ধ ঘরে থাকতে চায় না। ভাইয়ের এরকম কষ্ট আর কান্নাকাটি আমরা সহ্য করতে পারি না। আমাদেরও বয়স হয়েছে, তবুও কষ্ট করে অসুস্থ ভাইকে ঘর বাহির আনা নেওয়া করি। কেউ যদি আমাদের এই পাগল ভাইটাকে একটা হুইল চেয়ার কিনে দিত, তাহলে ভাইটা বাইরে ঘোরাফেরা করতে পারতো। আমাদের এই প্রতিবন্ধী ভাইটা সহ দুই বিধবা বোনের কষ্ট লাঘব হতো।

স্থানীয় কিন্টার গার্ডেন শিক্ষক আব্দুল জব্বার (৩৮), পল্লী চিকিৎসক জাহাঙ্গীর আলম (৪০), খলিলুর রহমান (৫৬), রফিকুল ইসলাম (৪০) সহ আরো অনেকে জানালেন, জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় কর্ম ক্ষমতা ছিল না আব্দুল মজিদের। ভিক্ষাবৃত্তি করেই জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। জীবদ্দশায় বিয়ে করলেও শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় সংসার জীবন টেকসই হয়ে ওঠেনি আব্দুল মজিদ পাগলার। বিয়ের কিছুদিন পর স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেলে পরে আর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি তিনি। এখন বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে শরীরে চেপে বসেছে নানান রোগ। বয়সের ভারে এখন আর আগের মতো চলাফেরা করতে পারেন না। মজিদ পাগলার আপনজন বলতে বিধবা দুই বোন ছাড়া তার আর কেউ নেই। কিন্তু বোনেরাও অসচ্ছল। তবুও ঠাঁই নিয়েছেন সেখানে। শেষ বয়সে এসে তিন ভাইবোন মিলে অতি কষ্টে দিনযাপন করছেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *