আগামীর লড়াইয়ের প্রস্তুতি

শিক্ষা ও ক্যাম্পাস
টিকে থাকার জন্য তোমার মন্ত্র হবে—লার্ন, আনলার্ন ও রিলার্ন—শেখো, ভুলে যাও, আবার শেখো। ছবি: স্বপ্ন িনয়ে
টিকে থাকার জন্য তোমার মন্ত্র হবে—লার্ন, আনলার্ন ও রিলার্ন—শেখো, ভুলে যাও, আবার শেখো। ছবি: স্বপ্ন নিয়েকরোনা

পরিস্থিতির উন্নতি যদি না হয়, তাহলে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকতে পারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মনেপ্রাণে আশা করছি, এমনটা হবে না। কিন্তু যদি হয়েই যায়, তাহলে প্রায় সাত মাসের ‘অনির্ধারিত’ ছুটির কবলে পড়ে যাবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। যদিও বিকল্প উপায়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজছে সরকার। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন অনলাইনে ক্লাস ও পরীক্ষা চালিয়ে যেতে পারে, সে জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবে বলে জানা গেছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও কীভাবে সক্রিয় রাখা যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা চলছে।

তবে এত দীর্ঘ সময় শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরতে না পারার ইতিহাস সাম্প্রতিক কালে দেশে নেই বললেই চলে। গত শতকের আশির দশকে এমনটা প্রায়ই হতো এবং এর ফল হতো সেশনজট। ১৯৮৮ সালে যাঁদের প্রকৌশলী হওয়ার কথা, তাঁরা তিন বছর পর হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়ারা, তোমরা কি চেষ্টা করলে এবার এ রকম কিছু এড়াতে পারবে? পারবে।

এ বছর যারা এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছ, পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলেই কিন্তু তোমাদের ফলাফল প্রকাশিত হবে, কলেজে ভর্তি হবে। এখন যেহেতু তোমাদের কলেজে ভর্তির জন্য পরীক্ষা দিতে হয় না, কাজেই তুমি তোমার সময়টাকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারো। বাড়িতে যত বই আছে, সেগুলো পড়ে ফেলতে পারো। ইন্টারনেটেও অনেক বই পড়তে পারবে। কিন্তু মনে রাখবে, তোমাদের এইচএসসির সময় হয়তো কমে যেতে পারে। তখন বাড়তি চাপ যেন না পড়ে, তাই এখন থেকেই এইচএসসির সিলেবাস জেনে নিজেকে এগিয়ে রাখা দরকার।

এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা, তোমরা তোমাদের প্রস্তুতি, চূড়ান্ত রিভিশন দেওয়াটা চালিয়ে যাও। সময়ের অভাবে যে দু–একটা অধ্যায় দেখতে পারোনি, সেটাও দেখে নাও। তবে বাসায় যেহেতু আছ, বাবা-মাকে সময় দাও, ভাইবোনদের সঙ্গে আনন্দে কাটাও। পরিস্থিতি ভালো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তোমাদের পরীক্ষা, দ্রুততম সময়ে ফল প্রকাশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কার্যক্রম নিশ্চয়ই শুরু হয়ে যাবে।

আর যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছ?

তোমাদের বেশির ভাগই নিজ নিজ গ্রামে কিংবা শহরে নিজের পরিবারে ফিরে গেছ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর এত দীর্ঘ সময়ের জন্য হয়তো কখনো বাড়িতে থাকা হয়নি। কাজেই এখন তোমাদের প্রথম কাজ হবে পরিবারের সঙ্গে প্রচুর সময় কাটানো। অনলাইনে ক্লাস, ফেসবুকে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, লাইক-শেয়ারের পরও তোমাদের একটা দীর্ঘ সময় মা–বাবা, ভাইবোন, দাদি-নানির সঙ্গে কাটানো দরকার। তাঁদের সঙ্গে গল্প করো। নানা বিষয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতার ভাগ নাও।

এত কিছুর পর দেখবে, তোমার হাতে আরও সময় আছে। তুমি যে বিষয়ে পড়ছ, সেই বিষয়ে সময় দাও। বিশ্ববিদ্যালয় চলাকালে হয়তো তুমি শুধু গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো দেখেছ। কিছু সহজ অধ্যায় পরীক্ষায় আসে না বলে বাদ দিয়েছ, সেগুলোর প্রতি নজর দাও। বিশ্বের সেরা সেরা বিশ্ববিদ্যালয়, যেমন এমআইটি, হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অনেক কোর্স ইন্টারনেটে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। সেখানে নিজের বিষয়ের কোর্সে যোগ দাও।

তারপরও তোমার হাতে সময় থাকবে। এই সময় ‘আগামী দিনের তোমাকে’ গড়ে তোলার জন্য কাজে লাগাও। এই করোনাকালের অভিজ্ঞতা ও বছর কয়েক ধরে আগ্রাসী হওয়া চতুর্থ শিল্পবিপ্লব সামনের কর্মবাজারকে একেবারে বদলে ফেলবে। সেখানে টিকে থাকার জন্য মন্ত্র হবে—লার্ন, আনলার্ন ও রিলার্ন—শেখো, ভুলে যাও, আবার শেখো। এই শেখার একটা বড় অংশ তোমাকে করতে হবে ইন্টারনেটে। এই সময়ে তাই তুমি শেখার অনলাইন প্ল্যাটফর্মে (ইউডেমি, কোর্সেরা ইত্যাদি) বিভিন্ন কোর্সে যুক্ত হও। সবাই এখন তাদের অনেক কোর্সে বিনা মূল্যে অংশগ্রহণের সুযোগ দিচ্ছে, সেই সুযোগ কাজে লাগাও। ইংরেজি ভাষাজ্ঞান ঝালিয়ে নাও। বিশেষ করে নিজেকে যাচাই করা, নেতৃত্বের বিকাশ এবং যোগাযোগে দক্ষতা বাড়ানোর কোর্সগুলো তোমাকে আগামী দিনের লড়াইয়ে এগিয়ে রাখবে।

নিয়ম করে প্রতিদিন নিজেকে ১৫-২০ মিনিট সময় দাও, তারপর নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করাও। হিসাব নাও, আজ যা করার কথা ছিল, তা কি করেছ? তুমি কি তোমার লক্ষ্যের দিকে এক কদম এগিয়েছ? উত্তর যদি না-সূচক হয়, তাহলে পরদিনের রুটিন বদলে ফেলো। সামনের দিনগুলোর কথা ভেবে নিজের বর্তমানকে সাজাও।

তোমাদের সামনের দিনের লড়াইয়ে জয়ের জন্য রইল শুভকামনা। ভালোবাসা।

লেখক: প্রথম আলো যুব কার্যক্রমের প্রধান ও বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সাধারণ সম্পাদক

 সূত্র: প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *